মিশরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লিখ।

মিশরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লিখ।

মিসরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আলোচনা কর।

অথবা, মিসরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লেখ।

উত্তর ভূমিকা: মামলুক বংশ ছিল মূলত ক্রীতদাসদের বংশ। নানা দেশ, নানা জাতির ক্রীতদাসরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিসরে সামরিক শাসন কায়েম করে। তাই শুধু মুসলিম ইতিহাসেই নয়; গোটা বিশ্বের ইতিহাসেই এই মামলুকদের উত্থান ও সমৃদ্ধি প্রায় নজিরবিহীন। ক্রীতদাস থেকে সুলতানের সর্বোচ্চ শিরোপা পাওয়া মামলুকরা সিরিয়া ও মিসরের মাটি থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ধর্মযোদ্ধাদের. শেষ চিহ্নও মুছে ফেলেন। ২৬৭ বছর মামলুকদের দখলে ছিল মিসর। এই অশিক্ষিত ও যুদ্ধবাজ মামলুকগণ মিসরকে সব দিক দিয়ে সমৃদ্ধি এনে দেন।


মিসরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: মামলুকগণ মিসরে আগমন করে আইয়ুবি সুলতান আস সালিহের সময়। আস সালিহের স্ত্রী সাজার উদ দার কর্তৃক মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। মিসরে মামলুকদের দুটি ধারা বর্তমান ছিল। একটি হলো বাহরি মামলুক এবং অন্যটি হলো বুরুজি মামলুক। এরা কীভাবে মিসরের শাসন ক্ষমতা দখল করে সে ইতিহাস নিম্নে তুলে ধরা হলো-

ক. বাহরি মামলুকদের ক্ষমতা লাভ: বাহরি মামলুকরা কীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন নিম্নে তার বর্ণনা দেওয়া হলো-

১. সাজার উদ দারের প্রাথমিক অবস্থা: সাজার উদ দার মালিক আস সালিহের স্ত্রী ছিলেন। পূর্বে আব্বাসি খলিফার দাসী হলেও তিনি মিসরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠায় করতে সক্ষম হন।

২. দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ: মালিক আস সালিহের সন্তান সাজার উদ দারের গর্ভে ধারণ করলে তিনি দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্তি পান।


৩. সাজার উদ দারের উপাধি গ্রহণ: সাজার উদ দারের পুত্রসন্তান জন্ম নেওয়ার পর তিনি স্বাধীন হয়ে যান এবং উপাধি লাভ করেন। তার সম্পর্কে ঐতিহাসিক আলি আজগর বলেন, "সাজার আল মুতাসিমিয়াহ আল সালিহিয়াহ মালিকাতিল মুসলেমিন ওয়ালা দাতিল মালিক আল মনসুর খলিফা আমিরুল মোমেনিন উপাধি গ্রহণ করেন।"

৪. খুতবা পাঠ ও মুদ্রা অঙ্কন: সাজার উদ দার ক্ষমতায় বসে নিজের ক্ষমতার বৈধ প্রতীকরূপে জুমআর নামাজে তার নামে খুতবা পাঠ করান। এমনকি তিনি নিজ নামে মুদ্রা অঙ্কন করতে আদেশ দেন।

৫. সাজার উদ দারকে মামলুকদের সমর্থন: তুরান শাহের মৃত্যুর পর মামলুকরা সরাসরি সিংহাসনে বসেনি। সাহসের অভাব বা চক্ষুলজ্জার কারণে তারা প্রভু বংশকে একেবারে উপেক্ষা করেনি। বংশের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেই এবং সাজার উদ দারের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে মামলুকগণ সাজার উদ দারকে সুলতানা মনোনীত করেন।


৬. সাজার উদ দারকে তিরস্কার: সাজার উদ দার যখন ক্ষমতা লাভ করেন, তখন ব্যঙ্গ-বিদুপের অনেক তীরই বিদ্ধ করেছে। তাকে। এই সুলতানকে ব্যঙ্গ করে আব্বাসি খলিফা মামলুকদের উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গাত্মক চিঠি লিখে পাঠায়। ঐতিহাসিক P. K. Hitti 'র বর্ণনা মতে, চিঠিতে ছিল "তোমাদের শাসন করতে যদি পুরুষের অভাব হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের বল, আমরা বরং একজন পুরুষ পাঠিয়ে দেব।"

৭. সাজার উদ দারের বিবাহ: আব্বাসি খলিফার চিঠিতে অপমানিত ও লজ্জিত হয়ে মামলুক আমিরগণ সাজার উদ দারের সহযোগী ও সেনাপ্রধান ইজুদ্দিন আইবেকের সাথে তাকে বিবাহ দেন এবং ইজুদ্দিনকে সুলতান হিসেবে মনোনীত করেন। পরবর্তীতে সাজার উদ দার ও ইজুদ্দিন আইবেক যৌথভাবেই সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন।

৮. প্রকৃত ক্ষমতার মালিক সাজার উদ দার: ইতোমধ্যে সালাহউদ্দিনের প্রপৌত্র দামেস্ক অধিকার করে মিসরে আক্রমণের উদ্যোগ করায় মামলুকেরা ৬ বছর বয়স্ক আল আশরাফকে ইজুদ্দিন আইবেকের সাথে যৌথ সুলতান নির্বাচিত করেন। ফলে প্রকৃত ক্ষমতা রানির হাতেই ন্যস্ত থাকে।


৯. আইবেককে হত্যা: কথিত আছে আইবেক মসুলের রাজার কন্যাকে বিয়ে করার ষঢ়যন্ত্র করলে সাজার উদ দার রাগে আইবেককে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন।

১০. সাজার উদ দারের: পতন আইবেককে হত্যা করার দায়ে আইবেকের প্রথম স্ত্রীর ক্রীতদাসীরা সাজারকে কাঠের জুতার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে মেরে ফেলেন। কথিত আছে যে, প্রাসাদের মিনার থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় তার মৃতদেহ।

খ. বুরুজি মামলুকদের ক্ষমতা লাভ: মিসরের মামলুক বংশের অন্যতম শাখা বুবুজি মামলুক। বুরুজি মামলুকরা কীভাবে বাহরি মামলুকদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মিসরের রাজসিংহাসন দখল করেন তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-


১. বুরুজি মামলুক বংশের পথপ্রদর্শক: সুলতান কালাউন ছিলেন বাহরি মামলুক সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুলতান। তিনি ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতায় আসেন এবং ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে তার ক্ষমতার অবসান হয়। সুলতান কালাউন একটি সুদক্ষ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ক্রুসেডারদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং তাদের দুর্গ নির্মাণ করতে বাধা দেন। সুলতান কালাউনের সুদক্ষ ককেশিয়ান সেনাবাহিনী ক্রুসেডারদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে। ক্রুসেডারদের পরাজিত করার সাথে সাথে মোঙ্গলরা মিসরে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কালাউন মাত্র ১ হাজার মামলুক সৈন্য নিয়ে একটি পাহাড়ের শিখরে অস্ত্র ধারণ করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। প্রকৃতপক্ষেই কালাউন একজন দক্ষ সংস্কারক ছিলেন। তার আমলেই বুবুজি মামলুকদের উৎপত্তি ঘটেছিল। সুলতান কালাউনের সেনাবাহিনীতে ১২ হাজার সদস্যের মামলুক বাহিনী ছিল। এরা ছিল খুবই সুশৃঙ্খল ও সুগঠিত। কালাউনের ১২ হাজার সৈন্যের মধ্যে মাত্র ৪ হাজার সৈন্য ছিল ককেশিয়ান গ্রিক। সুলতান কালাউন এই ৪ হাজার সৈন্যকে আলাদা বুরুজে অবস্থান করার জন্য সুউচ্চ বুরুজ নির্মাণ করেন। এ কারণে সুলতান কালাউনকে বুরুজি মামলুক বংশের পথপ্রদর্শক বলা হয়। যেহেতু সুলতান কালাউনের সময় এসব সৈন্য আলাদাভাবে সুউচ্চ বুবুজে রাখার ব্যবস্থা করেন, তাই কালাউনকেই বলা যায় তিনিই বাহরি মামলুকদের পতনের মূলে প্রকৃত ব্যক্তি ছিলেন। তার ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার কারণেই বুবুজি মামলুকদের উৎপত্তি ঘটে।


২.বুরুজি মামলুকদের মিসরের ক্ষমতা লাভ: আলাউদ্দিন আলি ছিলেন বাহরি মামলুক বংশের সুলতান। আলাউদ্দিন আলির শাসনকাল ছিল খুব সংক্ষিপ্ত। তিনি পিতার মতো শক্তিশালী শাসক ছিলেন না। তিনি আমিরদের দমনে তেমন কৃতিত্ব রেখে যেতে পারেননি। তার সময়ে বুরুজি মামলুক দলপতি বারকুক প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। বুরুজি মামলুক দলপতি বারকুক ছিলেন ককেশিয়ান। ক্ষমতালিঙ্গু বারকুক আলাউদ্দিন আলির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে পদচ্যুত করে সুলতান শাবানের কনিষ্ঠ পুত্র ছয় বছর বয়স্ক সালাহউদ্দিন হাজি আলি সালিহকে সিংহাসনে বসান এবং বারকুক সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হন। এরপর দেশের দুরবস্থার প্রতি লক্ষ করে ১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে একদিন দরবার কক্ষে তিনি ঘোষণা করেন যে, দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এই বালকের পরিবর্তে একজন বলিষ্ঠ মানুষের সুলতান হওয়া প্রয়োজন। তখন সভার লোকজন এক বাক্যে তাকেই সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে এবং তার সামনে সবাই মাথানত করে। ফলে সেই দিন থেকে ১৩২ বছর পর বাহরি মামলুকদের শাসন শেষ হয় এবং বুরুজি মামলুকদের শাসন শুরু হয়।


উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ১৩২ বছরের মধ্যে প্রথম দিকের বাহরি মামলুক শাসকগণ শক্তিশালী ও কূটকৌশলী ছিলেন। কিন্তু শেষদিকের শাসকদের বয়স কম ছিল বলে বুদ্ধি বিবেচনা ঠিকভাবে করতে পারত না। যার ফলে বারকুক হাজি আল সালিহকে পদচ্যুত করে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। যাই হোক, বাহরি বা বুরুজি এই দুই মামলুক বংশই ক্রীতদাসের বংশধর ছিল। বাহরি ও বুরুজি মামলুকদের সময়ে সমান তালে মিসরে সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। মিসরের অধিকাংশ স্থাপত্যশিল্প এই মামলুকদের সময়েই নির্মিত হয়েছিল।

 

Post a Comment

Previous Post Next Post